সাকিবের অনুশীলন ছাড়া মাঠে সফলতা কী বার্তা দিচ্ছে

বাংলাদেশ প্রেমিয়ার লিগের চট্টগ্রাম পর্বে একদিনও অনুশীলন করেননি ফরচুন বরিশালের অধিনায়ক এবং বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান।

তবে তার পরও সাকিব এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রেমিয়ার লিগ- ২০২৩ এর সেরা ক্রিকেটার।মাঠে ও মাঠের বাইরের নানা কারণে, নানা ঘটনায় নিয়মিতই সাকিব আল হাসান আলোচনায় আসেন।

এবারে তিনি অনুশীলন না করেও মাঠে দারুণ পারফরম্যান্স করে আলোচনায় এসেছেন।চট্টগ্রাম থেকে বিপিএল কাভার করে আসা ক্রিকেট বিশ্লেষক ও পরিসংখ্যানবিদ রিফাত এমিল মনে করেন,

শুধু সাকিবই নন, তার দলের অন্য সদস্যরাও এমন ঘটনায় অভ্যস্ত।এতে দলেরও তেমন প্রতিক্রিয়া থাকে না।বিবিসি বাংলাকে রিফাত এমিল বলেন,

“চট্টগ্রামের দলের বাকিরা অনুশীলন করলেও সাকিবকে দেখা যায়নি। এমনকি একবারের জন্যও না।”চট্টগ্রাম পর্ব তো বটেই, ঢাকাতেও সাকিবকে খুব একটা জোরালো অনুশীলন করতে দেখা যায়নি।

কিন্তু মাঠে সাকিবের পারফরম্যান্সে তার প্রভাব দেখা যায়নি, যে কারণে বাংলাদেশ প্রেমিয়ার লিগ- ২০২৩ এ এখনো পর্যন্ত সেরা ক্রিকেটার সাকিবই।

সাকিবের পারফরম্যান্স কেমন?ক্রিকেট বিষয়ক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফোর ইমপ্যাক্ট মিটার বলছে সাকিবের পয়েন্ট ৫৩০.৬৩।ইএসপিএন ক্রিকইনফো টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণের জন্য শুধু রান বা উইকেটের দিকে না তাকিয়ে, তার পারফরম্যান্স দলের জন্য কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল,

তা পরিমাপ করতে ‘ইমপ্যাক্ট’ বিচার করে থাকে।ইমপ্যাক্টের বিচারে সাকিবের ধারে-কাছেও নেই বাংলাদেশ প্রেমিয়ার লিগের চলমান আসরের কোনও ক্রিকেটার।মিটারে দ্বিতীয় স্থানে থাকা নাসির হোসেনের পয়েন্ট ৩৮১.৩২, আর সাকিবের বিপিএল সতীর্থ পাকিস্তানের ইফতিখার আহমেদের ৩২২.৫৭।

একই সাথে সাকিব চলতি টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বেশি রানের মালিক।এবারের বিপিএলে সাকিব আল হাসানের পরিসংখ্যানকে অবিশ্বাস্য বলছেন অনেকেই।পাঁচ ইনিংস ব্যাট করে সাকিব ২৭৫ রান তুলেছেন ৯১ গড়ে।তার স্ট্রাইক রেট ১৯৬, যা বাংলাদেশ প্রেমিয়ার লিগ ইতিহাসেরই সেরা।বল হাতে সাকিব আল হাসান ছিলেন মিতব্যয়ী।

এখনও পর্যন্ত ২২ ওভার বল করে ১৩৩ রান দিয়েছেন।আর উইকেট না নিলেও কম খরুচে ওভার করে প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছেন ফরচুন বরিশালের অধিনায়ক।এখনও পর্যন্ত ৫ ইনিংস ব্যাট করে তিনটিতেই ৫০ এর বেশি রান করেছেন।একটি ম্যাচে ৪৩ বলে ৮৯ রান করেছেন, যা ৩৫ বছর বয়সী সাকিবের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস।অনুশীলনে সাকিব না থাকায় দলের প্রতিক্রিয়া কী?ক্রিকেট বিশ্লেষক ও পরিসংখ্যানবিদ রিফাত এমিল বলেছেন,

দলের প্রতিক্রিয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল।তিনি বলেন, “এমন সাকিবকে দেখে তো আদতে সবাই অভ্যস্ত। সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শো-রুম উদ্বোধন করেন, আবার পরে মাঠে গিয়ে ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স।”ফরচুন বরিশালের সহকারী কোচ মিজানুর রহমান বাবলু বিবিসিকে বলেছেন, ম্যাচ জয়ের জন্য যেমন পরিকল্পনা করা দরকার, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সাকিব সেই পরিকল্পনাগুলো করেই মাঠে নামে।তিনি বলেন, “আপনারা শুধু বাইরের দৃশ্যটা দেখেন। যে অনুশীলন করে নাই, ব্যাটিং করেনাই, বোলিং করেনাই। কিন্তু খেলায় এর বাইরেও আরও অনেক দিক আছে।”

“যারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে তাদের সূচি এতো বেশি ঠাসা থাকে, অনেক সময় অনুশীলনের চেয়ে বিশ্রামটা বেশি জরুরী হয়ে পড়ে, কারণ ও তো খেলার মধ্যেই আছে, ম্যাচের মধ্যেই থাকে,” বলেন মি. বাবলু।সাকিবের ব্যাপরে মি. বাবলু বলেন, সবাই ভালো খেলছে কিন্তু প্রথম ম্যাচ হারার পরে সাকিবের মতো অনুপ্রেরণাদায়ী কোনও পারফরম্যান্স দরকার ছিল।তিনি সাকিবের ৪৩ বলে ৮৯ রানের ইনিংস দেখে সাকিবকে বলেছেন, “তুমি আমার দেখা লাইফে সেরা ইনিংসটি খেলেছো।”সাকিব আল হাসানের দীর্ঘদিনের মেন্টর ও ফরচুন বরিশালের প্রধান কোচ নাজমুল আবেদিন ফাহিম মনে করেন, “সাকিব তার ব্যাটিংয়ের সেরা সময়টা কাটাচ্ছেন এখন।”সাকিবের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্যর্থ হওয়ার পর সাকিব নিজেকে ‘আপডেটেড’ করেছেন এবং তার পারফরম্যান্সে কিছু পরিবর্তন এনেছেন।আর তার সুফলও তিনি এখন পেতে শুরু করেছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।বাংলাদেশের প্রথম বিভাগ লিগের ক্রিকেটার ও ক্রিকেট উপস্থাপক সৈয়দ আবিদ হুসেইন সামি নিজের বিশ্লেষণে বলেছেন, “২০২১ সালের পর থেকে সাকিব ধীরে ধীরে ক্রিজে দাঁড়ানোর ধরন বদলান। এবারে সাকিব তার পূর্ণ সফলতা পাচ্ছেন।”

“বোলার যখন বল ছোড়েন তখন সাকিব খানিকটা পেছনে গিয়ে বলে জোর বাড়ানোর জন্য শক্তি সঞ্চয় করেন এবং বাড়তি জায়গা ও সময় পান তখন,” বলেন তিনি।লেগ সাইডে টেনে মারার জন্য বাড়তি শারীরিক শক্তি প্রয়োজন হয় বলে মনে করেন মি. সামি।এই জায়গাটায় সাকিব কাজ করেছেন বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।ক্যারিবিয়ান প্রেমিয়ার লিগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে নিজের নতুন টেকনিক বাস্তবায়ন করতে সফল হয়েছিলেন সাকিব।সাকিবের পারফরম্যান্স এনালাইসিসে ক্রিকেট লেখক ও পরিসংখ্যানবিদ রিফাত এমিল বলেন, “প্রশ্ন উঠতে পারে, যে ক্রিকেটার অনুশীলন না করে এতো ভালো করেন তিনি অনুশীলন করলে কতো ভালো করবেন?”।

“ক্রিকেট তো শুধু মাঠের খেলা না, অনেকখানি মনস্তাত্ত্বিকও,” বলেছেন রিফাত এমিল।তিনি এই একটা জায়গায় সাকিব আল হাসানকে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে বলে মনে করেন।দুই মাস পরই সাকিবের বয়স হতে যাচ্ছে ৩৬, এর আগে সাকিব আল হাসানের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে পাওয়ার হিটিং নিয়ে প্রশ্ন ছিল।এই বয়সে এসে তিনি ক্রিকেটের সবচেয়ে নবীন সংস্করণে নিজের খেলার ধরন বদলেছেন, এই ব্যাপারটাকে আলাদা করে উল্লেখ করেছেন মি. এমিল।“বোলিং তো সবসময় সহজাত, টি-টোয়েন্টিতে ব্যাটিং নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এমনিতে না দেখে গেলেও সাকিবের মাথায় সবসময় ক্রিকেটই থাকে।

সঙ্গে গ্রিপে খানিক পরিবর্তন এনে হিটিং এবিলিটি বাড়িয়েছেন সাকিব।”চলতি বিপিএলে গড়ে প্রতি ৩.১১ বলে সাকিবের ব্যাট থেকে এসেছে একটা করে চার কিংবা ছয়।এবারের বিপিএলের প্রথম ব্যাটার হিসেবে ৩০টি চার এবং দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে স্পর্শ করেছেন ১৫টি ছক্কা হাকানোর রেকর্ড।কেবল মাঠে ভালো ক্রিকেটেই খেলেননি, সাকিব আল হাসান বিপিএলের শুরু থেকে আলোচনায় ছিলেন।মাঠে ঢুকে আম্পায়ারের সাথে তর্ক করে ম্যাচ ফির ১৫ শতাংশ জরিমানাও দিয়েছেন সাকিব।